বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত সূচিপত্র

বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত সূচিপত্র – অধুনা এতদ্দেশে দিন দিন জাতীয় সঙ্গীতের আদর বৃদ্ধি হইতেছে। কণ্ঠ ও যন্ত্র সঙ্গী’ত শিক্ষাবিধায়ক বিবিধ পুস্তক প্রণীত ও প্রচার বাহুল্যই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। স্বর-লিপির উপকারিতা বিষয়ে সাধারণের এরূপ শুভ সম্মতি নিতান্ত সুখের রিষয়।

বস্তুত, যে বিদ্যা বর্তমানে লিপিবদ্ধ হইয়া ভবিষ্যৎ জনগণের কর্ণ কুহরে মন্ত্র প্রদান না করে, সে বিদ্যার উন্নতি ও শিক্ষা-পথ অত্যন্ত জটীল ও জঞ্জালপূর্ণ। কিন্তু ধ্বংশ-পথ অতি প্রশস্ত। একটা রাজ-বিপ্লব অথবা দেশব্যাপী মহামারী সংক্রমণে তাহা অনন্ত কাল- গর্ভে বিলীন হয়। এই জন্য, লিপিগত বিদ্যার আদর দেখিলে মনে প্রকৃতই আশার সঞ্চার হয়।

ভারতীয় সঙ্গী’ত-বিদ্যা-বিশারদ রাজ শ্রীযুক্ত শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর বাহাদুরের বীজ বপনে এক্ষণে সেই আশালতা সুফল প্রদান করিতেছে। পুরাতন গৎ, গান, আলাপ ও নূতন উচ্ছ্বাস সকল লিপিবদ্ধ হইয়া, সাধারণের নয়ন সম্মুখে উপনীত ও সাদরে গৃহীত হইতেছে। সুতরাং শিক্ষা-স্রোত যে একটু গতিশীল হইয়াছে, তাহা স্পষ্টই অনুভূত হয়।

বর্তমান সময়ে সুমধুর বেহালা যন্ত্রের উপর সাধারণের কিছু বেশী আশক্তি দেখা যাইতেছে; এই জন্য, যাহাতে বিনা গুরূপদেশে শুদ্ধ পুস্তক দেখিয়া ঐ যন্ত্র শিক্ষা ও তাহাতে পারদর্শিতা লাভ করা যায়, সেইরূপ উপযোগী করিয়া এই পুস্তকথানি প্রণয়ন করিয়াছি। কৃতকার্য্যতা লাভ কত দূর হইবে, তাহা শিক্ষার্থী মহাশয়দিগের বিচারাধীন। তবে, আমি এই মাত্র বলিতে পারি যে, অন্যূন পরতাল্লিস বৎসর কাল বেহালা বাজাইয়া যাহা কিছু অঙ্গুলী-গত হইয়াছে, তাহার সার-সংগ্রহে এই পুস্তকথানি সঙ্কলিত হইল।

স্বর-লিপির জটীলতা দেখিয়া কেহ যেন নিরুদ্যম হইবেন না। ক্রমে ক্রমে উঠিলে হিমাদ্রি লঙ্ঘনও সুসাধ্য হয়। স্থির বুদ্ধি, যত্ন ও সাধনা থাকিলে নিশ্চয়ই সিদ্ধি লাভ হইবে। স্বরলিপি-কৌশল, জ্যামিতি অপেক্ষা কিছু কঠিন নহে। তবে লয় ও সুর- বোধ যে দেব-দুল্লভ সামগ্রী, তাহাতে সন্দেহ মাত্র নাই; কিন্তু অভ্যাসও সামান্য জিনিষ নহে। অভ্যাস বলে নিত্য সুর নিচয় ও লয় জ্ঞান, পূর্ব্ব জন্মের স্মৃতির ন্যায় ক্রমে জাগরিত ও আয়ত্ত হইতে থাকে।

পরিশেষে পূর্ণ হৃদয়ে প্রকাশ করিতেছি যে, আমার পরম প্রিয়তম ছাত্র ধান্যকুঁড়িয়া নিবাসী শ্রীমান বাবু মহেন্দ্রনাথ গাইনের একান্ত যত্ন, উৎসাহ ও অর্থানুকূল্যে আমি পুস্তক খানি মুদ্রিত করিতে সমর্থ হইয়াছি। ভক্তিমান ছাত্র নিজে শিক্ষিত বলিয়া শিক্ষাকার্য্য প্রহ্লার জন্য গুরুর যথেষ্ট উপকার করিয়া চির-আশীর্ব্বাদের পাত্র হইয়াছেন। আরও কোন কোন মহোদয় আমাকে অথ সাহায্য করিয়াছেন, সে সকল নাম হৃদয়-ফলকে মুদ্রিত রহিল, ইতি।

গোকনা, ২৪ পরগণা। }

                                      }       শ্রীনবীনকৃষ্ণ হালদার।

আশ্বিন, ১৩০৩ সাল। }

 

বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত সূচিপত্র

 

বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত সূচিপত্র

  1. নাদ
  2. স্বর
  1. শ্রুতি
  2. গ্রাম
  1. মাত্রা
  2. লয়
  3. তান
  4. কর্ত্যব
  5. আরোহণ ও অবরোহণ
  1. তাল
  2. তালের বোল
  1. বেহালা
  1. বেহালার উৎপত্তি ও আকৃতি প্রকৃতি
  2. ধারণ প্রণালী
  1. সুর বন্ধন
  1. বাদন প্রণালী
  2. আঙ্গুল-পোষস্থ ও সুর নিচয়
  3. আঙ্গুল-পোষ ও স্বরস্থান চিত্র
  1. সাধন প্রণালী
  1. গত প্রকরণ
  2. অনলঙ্কত গত
  3. আসালঙ্কার
  1. আসালঙ্কত গত
  1. প্রভালঙ্কার
  2. গমক ও মৃচ্ছ না
  3. বিবিধালঙ্কত গত
  1. যুক্তালঙ্কার
  2. শ্রেষ্ঠালঙ্কার
  3. ইংরাজী গত
  4. রাগ রাগিণী
  1. আলাপ
  2. রাগাদির আলাপ
  3. গান
  4. পদ্য

 

বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত সূচিপত্র

 

গণিত সঙ্গীত

সপ্ত স্বর | বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত

  • সপ্ত স্বর

স্বর সম্বন্ধ | বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত

  • স্বর সম্বন্ধ

শ্রুতি বিভাগ | বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত

  • শ্রুতি বিভাগ

শ্রুতিসমূহের অঙ্কগত হিসাব | বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত

  • শ্রুতিসমূহের অঙ্কগত হিসাব

গ্রাম ও জাতি বিবরণ | বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত

  • গ্রাম ও জাতি বিবরণ

সপ্ত গ্রাম সংস্থান | বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত

  • সপ্ত গ্রাম সংস্থান

OPINION.

এই পুস্তক সম্বন্ধে কলিকাতা মহানগরীর সুপ্রসিদ্ধ সঙ্গীত-বেত্তা, বেহালা প্রভৃতি বিবিধ যন্ত্রের অদ্বিতীয় অধ্যাপক শ্রীযুক্ত লবো সাহেব মহোদয়ের মন্তব্য।

“I do hereby certify that Babu Nabin Kristo Haldar has com- posed a book of songs in Hindu-music, and I have made him play and sing all the pieces over to me from his said book. I find the composition to be very excellent and I can confidently recommend the book to all Rajahs, Zeminders, Hindu Gentlemen &c. &c. who are lovers of music and song.”

(Sd.) C. Lobo.

উপক্রমণিকা।

সঙ্গীত

“গীতং বাদ্যঞ্চ নৃত্যঞ্চ ত্রয়ঃ সঙ্গীতমুচ্যতে।

• গীত, বাদ্য এবং নৃত্য এই ত্রিবিধ ক্রিয়ার নাম সঙ্গীত। ইহারা পরস্পর এক যোগে, অথবা পৃথক রূপে সাধিত হইলেও, সঙ্গীত অভিধানে অভিহিত হয়। তন্মধ্যে নৃত্য ও বাদ্য সুদ্ধ উৎসাহ ব্যঞ্জক; এই জন্য কেবল উৎসবাদি কার্য্যে উহা অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। রাগ রাগিণী ও গীতই প্রকৃত সঙ্গীত। ইহা দ্বারা মানব কুল, হৃদয়ের মর্ম্মস্থান উদ্‌ঘাটিত করিয়া, মৰ্ম্ম কথা প্রকাশ করিতে, ও অতি শুষ্কপ্রাণ ব্যক্তিরও সহানুভূতি লাভ করিতে, অনায়াসেই সমর্থ হয়।

আবার যখন উহাদিগের সুসংযোগ সংঘটিত হয়, তখন সংসারের কোন পদার্থই মধুরতায় উহার নিকট স্থান প্রাপ্ত হয় না। এই জন্য জগতের যাবতীয় জনগণ, ঐ সঙ্গীত শুনিবার জন্য ব্যস্ত, এবং শিখিবার জন্য লালায়িত। কিন্তু শুনিবার অপ্রতুল না হইলেও গুনাইবার শক্তি লাভ করা বড় সহজসাধ্য নহে। অতুল ধনরত্বাধিকারী রাজরাজেশ্বরের অক্ষয় ভাণ্ডার, অথবা প্রবল পরাক্রান্ত দুর্দ্ধর্ষ বীর • পুরুষের আরক্তিম লোচন, কিছুতেই উহাকে অনায়াসে উপার্জন করিতে পারে না। শুরুপদেশ গ্রহণ পূর্ব্বক শুদ্ধাচারে ও একান্ত মনে সাধনা করিতে পারিলে, তবে ঐ স্বর্গীয় সামগ্রী ক্রমে ক্রমে আয়ত্ত হইতে থাকে।

[ ২ ]

এই যে দেবদুর্লভ সঙ্গীত, ইহার স্বভাব কি? কিরূপেই বা ইহা কার্য্যকারী হয় এবং ইহা দ্বারা মানব সমাজ কি উপকারই বা প্রত্যাশা করেন? তাদৃশ অর্থকরী বিদ্যা ত নয়, তবে কি জন্য লোকে জীবনের দীর্ঘকাল ব্যাপিত অস্থি ভঙ্গ পরিশ্রম করিয়া উহা অভ্যাস করিবে?

মনোমধ্যে যুগপৎ এই সকল প্রশ্ন উদিত হইলে, বিষম চিন্তায় পতিত হইতে হয়। কিন্তু কোন একটা মীমাংসায় উপনীত হওয়া নাকি মনুষ্যের স্বভাবসিদ্ধ ধৰ্ম্ম, এই জন্য আমরাও উহাতে বঞ্চিত হইতে ইচ্ছা করি না। অতএব উন্মত্তের অলীক প্রলাপের ন্যায় যাহা কথঞ্চিৎ কথিত হইবে, সহৃদয় পাঠকবর্গের নিকট তাহা অবশ্যই মার্জনীয়, আমাদিগের ইহাই কেবল একমাত্র ভরসা স্থল।

পরম করুণাময় পরমেশ্বর আমাদিগকে ভক্তি, শ্রদ্ধা, করুণা প্রভৃতি কতকগুলি কমনীয় মনোবৃত্তি প্রদান করিয়া, অনন্ত সুখের অধিকারী করিয়াছেন। সঙ্গীতও সেইরূপ একটা মানসিক শক্তি বিশেষ। অল্লাধিক পরিমাণে মনুষ্যমাত্রেই ঐ সঙ্গীতশক্তির অধিকারী।

(১) কোন আকস্মিক ঘটনা উপস্থিত হইলে হৃদয়স্থ সঙ্গীত লহরী আপনা হইতেই উত্থিত হইয়া নিদ্রিত বৃত্তি নিচয়কে জাগরিত করিয়া দেয়, ও তন্মুহূর্তেই কণ্ঠ- পথ বা অঙ্গচালনাদি সঙ্কেতে মনোগত উপস্থিত ভাবের জাজ্জল্যমান অভিনয় করিতে থাকে। ইহার প্রমাণ সংগ্রহ জন্য অধিক আয়াস পাইতে হয় না। কোন আনন্দজনক ঘটনা উপস্থিত হইলে, হুকুমারমতি বালক বালিকাগণ, এক অভূতপূর্ব্ব কলরব করিয়া উঠে; ও করতালি সহযোগে নৃত্য করিতে করিতে সেই দিকে ধাবিত হয়।

মাতৃ-ক্রোড়স্থ দুগ্ধপোষ্য শিশু, ক্ষুধা শান্তির পর স্মিতবদনা প্রস্থতির করাবলম্বনে নাচিয়া নাচিয়া তাঁহার পিপাসিত প্রাণে অমৃতধারা বর্ষণ করে। আবার সেই দুরন্ত শিশু জননীর জগন্মোহন ঘুম পাড়ানিয়া গানে নিদ্রিত হয়। এই সকল প্রমাণ দর্শনে ইহা প্রতিপন্ন হয় যে, সঙ্গীত রত্ন আমরা ভূমিষ্ঠ হইবার দিন হইতেই প্রাপ্ত হই, এবং অনুকূল ঘটনা সংযোগে তাহা হইতে আলোক বিকীর্ণ হইয়া, আমাদিগের অন্ধকারময় হৃদয়ক্ষেত্রকে জ্যোতিৰ্ম্ময় করিয়া তুলে। কিন্তু তথাপি ঐ অমূল্য নিধিকে, যিনি যে পরিমাণে পরিমার্জন করিবেন, তিনি সেই পরিমাণে আপনাকে আলোকিত ও শ্রোতৃমণ্ডলীকে পুলকিত করিতে সমর্থ হইবেন।

বিশুদ্ধ রাগ রাগিণীগুলি ঐরূপে মানবজাতির শৈশবাবস্থাতেই স্বজিত হইয়াছিল। যখন সেই পরমা প্রকৃতির অভিনব নন্দন জননীর অঙ্কশয্যার যোগনিদ্রাভিভূত ছিলেন, (১) কেহ কেহ আবার পূর্বজন্মের সাধনা যা দ্বেষপ্রসাদ ফলে ঐ সঙ্গীত পক্তিটা বাকরগত মণিবন্ডের ন্যায় প্রাপ্ত হইয়া জন্মগ্রহণ করেন। এক ব্যক্তি পঞ্চাশ বৎসর পরিশ্রম করিয়া কণ্ঠের পুর” ঠিক করিতে পারেন না, কিন্তু একটা পঞ্চম বর্ষীয় বালকের কণ্ঠে বিশুদ্ধ সপ্ত হরের সমাবেশ ইহা অনেকেই শুনিয়াছেন। ইহাই তাহার জন্মান্তরের সাধন দল।

[ ৩ ]

অমন সেই পর্ণ-কুটীর-ময় হুতিকাগারের চতুষ্পার্শ্বে, কখন বা ভূতগণের সৃষ্টি সংহারিণী ভয়ঙ্করী মূর্ত্তি, কখন, বা স্থিরসমুদ্রসম, অচল, অটল, সুগম্ভীর বাহুদৃশ্য ও কখন বা মধুরতার পরিপূরিত, হুগন্ধি কুসুমকাননের অপূর্ব্ব নবীন ভাব।

এই সকল বিসম্বাদী ঘটনা সংযোগে সেই প্রথম শিশুর কোমল হৃদয়, ভয়, বিস্ময় ও হর্ষাদি রসে উদ্বেলিত হইয়া, সঙ্গীতালোকে উজ্জলময় হইয়া উঠে; ও তন্মুহূর্তেই তাঁহার ইষ্টদেব স্বরূপ রাগ গুলি ঐ জ্যোতিৰ্ম্মর ক্ষেত্রে আসিয়া স্বরভূ রূপে সমুদিত হন। কেনই বা না হইবেন? উৎকণ্ঠ পাজে অমৃত রস সঞ্চিত হইলে তাহাতে আপনা হইতেই দানা বাঁধিয়া যায়।

যক্ষ, রক্ষ, দানবাদি পরিসেবিত ও ভীষণ সিংহ ব্যাজাদি সহুল ভূমণ্ডলের নাভি স্বরূপ, পবিত্র কৈলাস ভূধরে অবস্থান করতঃ ভগবান ভবানীপতি বিশ্বতত্ত্ব নিরূপণে উন্মত্ত রহিয়াছেন। রজনীযোগে, অসুরদিগের, হৈ, হৈ, রৈ, রৈ শব্দে ও হিংস্র জন্মদিগের জলদ গম্ভীর গর্জনে, উপত্যকা ভূমি ঘন ঘন কম্পিত ও প্রতিধ্বনিত হইতেছে। এমন সময় তপনদেবের অগ্রদূত স্বরূপ, শুক্র তারা সমুদিত হইল।

আর ভয় নাই, এখনই ঐ তিমির- বসনা-নিশা রাক্ষসী সহচরগণ সহিত পর্ব্বত গুহায় পলায়ন করিবে; হৃদয় কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ রসে ভরপুর হইয়া উঠিয়াছে। সেই শুভক্ষণে, অনাদিনাথ বিশ্বেশ্বরের মহিমা বর্ণনে নীলকণ্ঠের কণ্ঠ হইতে ভৈর রাগের সৃষ্টি হইবে, ইহা কোন্ ব্যক্তি বিশ্বাস না করিয়া থাকিতে পারেন?

বৈশাখের মধ্যাহ্ন সময়-প্রচণ্ড রবি কিরণে ভূমণ্ডল যেন দগ্ধ হইতেছে। তাহাতে আবার, দাবানল প্রজ্জলিত হইয়া, পর্ব্বতাকার অগ্নিরাশি সৃষ্টি ভষ্মীভূত করিতে করিতে প্রবল বেগে প্রধাবিত হইয়াছে। অশ্ব, হস্তী এবং হরিণাদি, আরণ্য পশু সকল দিক্ বিদিক্ জ্ঞানশূন্য হইয়া উর্দ্ধশ্বাসে ছুটিয়াছে। কেহ অগ্নিজালে বেষ্টিত, কেহ তড়াগমধ্যে পতিত এবং কেহ বা মদবারি সিঞ্চন করিয়া উত্তপ্ত শরীর শীতল করিতে নিযুক্ত।

সহসা এইরূপ প্রলয়কাল উপস্থিত দেখিয়া, সেই মাহেন্দ্র লগ্নে, পঞ্চতপত্রত পঞ্চাননকণ্ঠে দীপক রাগের আবির্ভাব হইবে, ইহাতে বিচিত্র কি! এইরূপ বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন রসের উচ্ছাসে ও বিভিন্ন কার্য্য কারণ সংযোগে, বিভিন্ন পাঞ্চভৌতিক ঘটনায়, ভাবে বিভোর হইয়া, মহাদেব, ভৈর, শ্রী, মেঘ, বসন্ত ও দীপক, এই পঞ্চরাগ সৃজন করিয়া পঞ্চাননে গান করিয়াছিলেন। তৎপরে ভগবর্তী পার্ব্বতী হইতে নট নারায়ণ রাগ গীত হইয়া, এই বড় রাগ ধরাধামে প্রচলিত হইয়াছে। (১)

রাগিণীগুলিও ঐরূপ এক একটা হৃদয়গত ভাব সমুদ্রের তরঙ্গ বিশেষ। উহাদিগকে,পুরবী, গৌরী, যোগিরা, ভৈরবী এবং সাহানা ইত্যাদি না বলিয়া শান্তি, ভক্তি, মায়া,মমতা ও আনন্দা বলিলেই যথার্থ নাম ধরিয়া ডাকা হয়।

(১) রাগ রাগিণীর সংখ্যা, জাতি ও অবয়বাদি সম্বন্ধে ভারতে বিবিধ মত প্রচলিত আছে। যথা; ভরত, কর্মীনাথ ও হনুমন্ত প্রভৃতি। কিন্তু অগ্নদ্দেশে ভরত ঋষির মতই প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত।

[ ৪ ]

কোন পতিবিয়োগবিধুরা রমণী, অথবা পুত্র-শোককাতরা জননী, অসহনীয় মৰ্ম্মব্যথায়, আত্মবিস্তৃত হইয়া, প্রমুক্ত কণ্ঠে রোদন করিয়াছিলেন। একু সুরজ্ঞ সংসার-চিত্র- করের হৃদয়-ফলকে তাহা চিত্রিত হইয়া ঐ প্রাণঘাতিনী ক্রন্দনের ধারাবলম্বনে কোমলময়ী ভৈরবী অথবা ললিতাদি রাগিণীর সৃষ্টি হইয়াছিল।

একদা শ্রাবণের রজনীযোগে আকাশ ঘনঘটাচ্ছন্ন, দিম্মগুল ঘোর অন্ধকারময়। রুম রুম, ঝুম ঝুম করিয়া অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হইতেছে। বাহু নিস্তব্ধ, সংসার নিদ্রিত। জাগরিত কেবল ভেকনিচয়। আর জাগরিত কোন দীর্ঘ প্রবাসীজনের গৃহাবগুণ্ঠনবতী পত্নী। সেই পতিরতা লঙ্কা, একাকিনী আপন প্রকোষ্ঠে বসিয়া, করতলে গণ্ড স্থাপন পূর্ব্বক নাথচিন্তায় উন্মনা।

দারুণ বিরহ যন্ত্রণার প্রবল পীড়নে সহসা প্রাণের মধ্যে বিষম আন্দোলন উপস্থিত হইয়া হৃদয় দুরু দুরু করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। আর থাকিতে পারিলেন না। গুরুগঞ্জনা ভয় আর স্থান পাইল না। অমনি সুকোমল কণ্ঠ ফাটিয়া, মৰ্ম্মস্থান হইতে স্বয়মাগত ক্রন্দনের ধার প্রবাহিত হইল।

আহা! সেই মধুর-অস্ফুট স্বরে আপনার দুঃখকাহিনীগুলি সংযুক্ত করিয়া, তিনি যে অমৃতময়ী প্রেমগাথা গাহিয়াছিলেন, যাহা শ্রবণ করিলে পাষাণ গলে, সাগর শুকার ও শুষ্কতরু মঞ্জরিত হয়, তাহার মহিমা বর্ণন করে কার সাধ্য? এবং কেই বা এমন ভাগ্যবান যে, সেই মর্ম্মভেদী স্বর্গীয় সুরের সহিত স্বকীয় হৃদয় মিশ্রিত করিয়া তাহা হইতে মোল্লারী আদি রাগিণী সৃষ্টি করিতে সমর্থ হইবেন? কিন্তু সমর্থ হইয়াছিলেন একজন, যাঁহার সংসার! যাঁহার সংসারে ঐ সকল ক্রন্দনের রোল উঠিয়াছিল; তিনি, সেই সর্ব্বলোক শ্রেষ্ঠ পিতামহ ঠাকুর।

অনন্তর ভগবান্ পদ্মযোনি তাঁহার বিস্তীর্ণ ভবগৃহে, ঐরূপ মোল্লারী আদির ন্যায় ছত্রিশটা অনুঢ়া কন্যা লইয়া সর্ব্বদা ব্যতিব্যস্ত। কন্যাগণ, কেহবা অতি দীনভাবে নিরন্তর রোদন কুরিয়া জগতের অশ্রু দর্শনে সংকল্পা। কেহ বা আনন্দময়ীর প্রতিমা সাজিয়া সংসারবাসীকে উল্লাস দানে তৎপরা। কেহবা বিভ্রম বিলাসভরে ভুজঙ্গ নিন্দিত বেণী বন্ধনে নিযুক্তা এবং কেহবা নবযৌবন গৌরবে অবিশ্রান্ত হাস্যরসে নিমগ্না। কুমারীদিগের ত এইরূপ অবস্থা।

ওদিকে আবার শিব-শক্তি সম্ভূত ষড়রাগ, সন্ন্যাসীর ন্যায় পথে পথে ভ্রমণ করিতেছে। অতএব প্রজাপতি মহাশয়, উহাদিগের পরস্পর কোষ্ঠী আদি দর্শন পূর্ব্বক উপযুক্ত কাল-লগ্নে এক একটা রাগের সহিত ছয় ছয়টা কন্যাকে লইয়া, দৃঢ়তর পরিণয় শুত্রে বন্ধন করিয়া দিলেন। অনন্তর অনুগত পরিজনবর্গের উত্তেজনায় ঐসকল রাগ রাগিণী হইতে অসংখ্য সন্তান সস্তুতির জন্ম হইয়া, আজ তাঁহার সংসার জাজ্জল্যমান ও আনন্দ কোলাহলপূর্ণ।

 

বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত সূচিপত্র

 

উৎসাহ, সাহস, গাম্ভীর্য্য ও সমর-লিপ্সা প্রভৃতি পুরুষোচিত ওজগুণযুক্ত ছয় রাগ। } প্রেম, বাৎসল্য, করুণা, ভক্তি প্রভৃতি স্ত্রী- জাতি সুলভ কোমল গুণযুক্তা ছত্রিণি রাগিণী।

ভৈর বা ভৈরব                            ••• ভৈরবী, সিন্ধু, রামকেলী, গুণকেলী, বাঙ্গালী, গুর্জরী।

শ্রী                            •••            •••  গোরী, ত্রিবেগী, মালশ্রী, কেম্বারী, পাহাড়ী, মধুমাধবী।

বসন্ত                        •••            ••• দেবগিরি, দেশী, বরাটী, টোড়ী, ললিতা, হিভোলা।

মেঘ                         •••            ••• মোল্লারী, সুরটা, কৌশিকী, সায়েরী, গান্ধারী, হয়শৃঙ্গারী

দীপক বা পঞ্চম                        ••• বিভাষী, ভূপালী, কর্ণাটা, পটহংসিকা, মালবী, পটমঞ্জরী।

নট নারায়ণ                              ••• কামোদী, কল্যাণী, আভিরী, নাটিকা, সারজী, হাম্বিয়া।

এক্ষণে মানবসমাজ সঙ্গীত হইতে কোন উপকার পাইয়া থাকেন কিনা, সেই বিষয় কথঞ্চিৎ লিখিত হইতেছে। সাধারণতঃ লোকে উহাকে কেবল আমোদ আজ্ঞাদের জিনিষই মনে করিয়া থাকেন। কিন্তু বাস্তবিক তাহা নহে। সাক্ষাৎ সম্বন্ধে সঙ্গীতের কোন উপ-কারিতা দৃষ্ট না হইলেও অলক্ষ্য ভাবে উহা হইতে আমরা প্রভৃত ফল প্রাপ্ত হইয়া থাকি।

স্কন্ধচ্যূত বিশাল হিমালয় শৃঙ্গ, শাল তাল তমালাদি বৃক্ষরাজি চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া নক্ষত্র বেগে পতিত হইতেছে; তাহাকে প্রতিরোধ করে এমন শক্তি বাহ্যজগতে নিতান্ত দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু অন্তর্জগৎ হইতে যদি ঐরূপ কোন বৃত্তি বিশেষ একান্ত প্রবলতা প্রাপ্ত হইয়া ঐরূপ কোন নির্দিষ্ট পথে প্রধাবিত হয়, তবে তাহাকে কেবল একমাত্র সঙ্গীত বন্ধনেই আবদ্ধ করা যাইতে পারে।

নৃশংসতার পূর্ণ মূর্ত্তি অসংখ্য মানবহন্তা রত্নাকর, মহর্ষি নারদের বীণা ঝঙ্কার মিশ্রিত রাম নাম গানে, মলিনতম লৌহ হইতে তপ্ত কাঞ্চনে পরিণত হইয়াছিলেন। অদ্যাপি হিন্দু জাতীয়গণ, সেই সুবর্ণ-খণ্ডের রেণুকা সংগ্রহ করিয়া সঙ্গীত পিপাসা নিবৃত্তি করিতেছেন। অতিবড় পাষণ্ড মহাপাপমতি প্রসিদ্ধ জগাই, বাধাই, নিতাই চৈতন্যের প্রাণবধে কৃতপ্রতিজ্ঞ হইয়া, মঠ বেষ্টিত প্রাচীরের অন্তরালে দণ্ডায়মান।

অন্তরে অন্য ভাব নাই, প্রতিক্ষণ কেবল সুযোগ অন্বেষণেই ব্যস্ত রহিয়াছে। এমন সময় সেই মঠ হইতে মধুর মৃদঙ্গ সহযোগে হরিনাম সঙ্কীর্তনের ললিত সুর লহরী তাহাদিগের কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল, এবং অনতি- বিলম্বেই সঙ্গীতের প্রাণচালিনী বৈদ্যুতিক শক্তিগুণে তাহাদিগের হৃদয়ে এক অনির্ব্বচনীয় রাসায়নিক কার্য্য আরম্ভ হইয়া, চিরপোষিত জীঘাংসাকালিমা ভক্তি স্রোতে বিধৌত হইয়া গেল। কজ্জলি হিঙ্গুলে পরিণত হইল। অনন্তর তাহারা দ্রুতবেগে চৈতন্যদেবের চরণতলে পতিত হইয়া মুক্তি ভিক্ষা ও দীক্ষালাভ করতঃ ভক্তিমার্গের চরমসীমায় উপস্থিত হইল।

শুদ্ধ ইহা বলিয়াও নহে; অমৃতময় সঙ্গীত সেবনে, কত কত উৎকট ব্যাধিগ্রস্তগণও চিরজীবনের জন্য সেই অসাধ্য রোগ হইতে বিমুক্তি লাভ করিয়াছেন। অদ্যাপি কোন কোন ধৰ্ম্ম সম্প্রদায় (১) কেবল মাত্র ভক্তি রসাশ্রিত গান গাহিয়া অসংখ্য রোগীকে আরোগ্য পথে আনিতেছেন। ইহার ভূরি ভূরি প্রমাণ নানা স্থানে প্রাপ্ত হওয়া যার।

সঙ্গীতের আর একটা বিশেষ গুণ এই যে, ইহা দ্বারা মানবের ধৰ্ম্মভাব যেমন রক্ষিত হয়, এমন আর কিছুতেই হয় না। যদি এ প্রদেশে যাত্রা, কীর্তন এবং কথকতা প্রভৃতি (১) কর্তা ভজা সম্প্রদায়। 

[ ৬ ]

বৰ্ম্ম সঙ্গীতগুলি না থাকিত, তাহা হইলে ধৰ্ম্ম যে কি পদার্থ সাধারণে তাহা কিছুই জানিতে পারিত না। সুতরাং আমাদিগের হৃদয়ও মরুময় ক্ষেত্রে পরিণত হইয়া, আমরা পশ্বাচারের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থল হইতাম, তাহাতে বিন্দুমাত্র সংশয় নাই। ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে দশ জন বাগ্মী বক্তৃতা করিয়া যে কার্য্য করিতে না পারেন, একটা ভাল যাত্রা সম্প্রদায় তদপেক্ষা অধিক কার্য্য করিতে সমর্থ।

আবার পূর্ব্ব কথাগুলি স্মরণ করিয়া দিবার, অথবা চিরস্মরণীয় করিয়া রাখিবার ক্ষমতা, সঙ্গীতের ন্যায় বুঝি আর কাহারও নাই। ইহা ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান এই কালত্রয়ের সূত্র স্বরূপ। বর্তমান সভ্য জগতের অতি আদরের সামগ্রী যে ইতিহাস গ্রন্থ, তাহা এই সঙ্গীত হইতেই প্রস্থত।

যে বেদ আর্য্যজাতির অতি পবিত্র ও পুরাতন ধন, তাহাও এক সময় সঙ্গীত- রূপে মানবের কণ্ঠেই প্রচারিত হইত। ফলতঃ সঙ্গীত, অতীত ঘটনা সকল বর্তমানে চিত্রিত করিয়া, কোন স্থলে বা ভবিষ্যতের নরকযন্ত্রণার ভয়ে ভীত করিতেছে; কখন বা অপ্সরা সেবিত পরমানন্দময় নন্দন কাননের সুখ সম্পত্তি দেখাইয়া, উৎসাহের উৎস খুলিয়া দিতেছে। এইরূপে সঙ্গীত, যাবতীয় মানবকুলের কার্য্য প্রণালী ও জীবন যাত্রার সামঞ্জস্য সাধনে নিযুক্ত থাকিয়া সংসারকে সুখস্থান করিয়া তুলিয়াছে।

অনন্তর জিজ্ঞাস্য এই যে, যদিও সঙ্গীতের বিবিধ মহোপকারিতা শক্তি আছে; কিন্তু তত অর্থকরী বিদ্যা ত নয়; তবে কি জন্য সমস্ত কার্য্য পরিত্যাগ করিয়া আয়াস ও যত্ন সহকারে, লোকে উহা অভ্যাস করিবে? এই প্রশ্নের উত্তর দানে আমি অক্ষম, কেননা অর্থই কি জগতের সার পদার্থ হইল? অর্থে কাহার সঙ্কুলান হয়? আপনা হইতে উর্দ্ধ- দিকে দৃষ্টিপাত করিলে ধনী দরিদ্র সবই এক সমান।

সকলেরই অভাব পরিপূর্ণ। তবে যদি সুখ ও শান্তি, জীবন বৃক্ষ ধারণের উৎকষ্টতুম-ফল ইহা সত্য হয়, তাহা হইলে আপনি হৃদয়- ক্ষেত্রে যে সঙ্গীত তরু রোপণ করিয়াছেন, তাহা হইতে প্রতি নিয়তই ঐ দুইটা অমৃত ফল আস্বাদন করিয়া, পাপ তাপ ও ভয়াদি সম্মল সংসারের ঘোর চক্র হইতে রক্ষিত ও আপনাকে বিমলানন্দ উপভোগের অধিকারী করিতে সমর্থ হইবেন, ইহা নিশ্চিত, এবং এই নিশ্চয়তা আছে বলিয়াই তৃষ্ণাতুর ব্যক্তিগণ অশেষবিধ বাধাবিপত্তি সহ্য করিয়াও ঐ পরামৃত লাভাশার জীবন ক্ষয় করিয়া থাকেন।

কিন্তু অর্থ উপার্জনই যাঁহাদের একমাত্র উদ্দেশ্য, তাঁহাদিগের জন্য ত বিবিধ ব্যবসায়ের পথ উন্মুক্ত রহিয়াছে। তাঁহারা এ ঝঞ্ঝাটে কেন আসিবেন? ইহাতে সুখ আছে, সম্পত্তি নাই; শান্তি আছে, সম্ভোগ নাই। অতএব ধাঁহারা ভোগ-বাঞ্ছাকে তুচ্ছ করিয়া সন্তোষের গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইবেন, তাঁহারাই এই পথে আসুন। আবার মান সম্ভ্রম অক্ষুণ্ণ রাখিয়া সঙ্গীতে যে একেরারেই অর্থাগম হয় না, তাহাই বা কি প্রকারে বলিব? যাঁহারা উৎকষ্টরূপ সঙ্গীত করিতে পারেন, তাঁহাদিগের কিছুই অকুলান থাকে না। জীবনোপায় জন্য অন্য পথ অবলম্বন না করিয়া যাহাতে তাঁহারা চিরজীবন ঐ সঙ্গীত ক্ষেত্রে নিযুক্ত থাকিয়া, উহারই উন্নতি সাধন করিতে 

 

বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত সূচিপত্র

 

[ ৭ ]

পারেন, ধনশালী মহোদয়গণের সে বিষয়ে সুদৃষ্টি নিক্ষেপ, ইহা চিরপ্রচলিত। তথাপি যদি ঐরূপ সংঘটন নাই হয়, তাহা হইলেও, কিছুমাত্র দুঃখের কারণ নাই। কেননা আপনি ত ধনোপার্জনের জন্য সঙ্গী’ত অভ্যাস করেন নাই? উহা যে ব্রহ্ম সাধনা; শুদ্ধ প্রাণের ব্যবসায়। উহাতে হৃদয় বিনিময় হয়।

এক প্রাণের ব্যথা আর এক প্রাণে ঢালিয়া দেওয়া যায়। উহার গতি, বিধি ও স্থিতি মনোরাজ্যে-জড়রাজ্যের সহিত কিছুমাত্র সংস্পর্শ নাই। সুতরাং পার্থিব ধনে উহা বিক্রীত হয় না। প্রেমের কি বাণিজ্য চলে?: আর বাণিজ্য মন্দই বা হইল কি? আপনার মানব জমিখানি আবাদ করিয়া সোণা ফলাইয়া লইলেন, আবার অর্থের কামনা কেন? সঙ্গীত ও অর্থ এই দুইটার মধ্যে কাহার গুরুত্ব অধিক, একটা তুলনা দ্বারা তাহা উত্তমরূপে অনুমিত হইতে পারে।

মনে করুন, যিনি আজীবন পরিশ্রম ও সাধনা করিয়া সঙ্গীতফল লাভ করিয়াছেন, তাঁহাকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, আপনাকে কোন ভাগ্যবস্তু পুরুষ এককালীন এক লক্ষ মুদ্রা দান করিলে, আপনি চিরজীবনের মত সঙ্গীত আলোচনায় ক্ষান্ত থাকিতে পারেন কি না? তাহা হইলে তিনি ইহার কি উত্তর করিবেন? বোধ হয় অবশ্যই বলিয়া উঠিবেন-“না! না! তাহা কখনই সম্ভবে না।

যে সঙ্গী’ত দুঃখময় জীবনের একমাত্র শান্তিবারি; যে যোগবলে আপনার ও অপরের জীবন, রাক্ষসের পুরী হইতে স্বর্গধামে লইয়া যাওয়া যায়; যাহার মধুরতায় মুগ্ধ হইয়া বনের পশুও বশ্যতা স্বীকার করে; যাহা আকর্ণনে শিশু নিদ্রিত হয়; যুবক জাগিয়া উঠে ও বৃদ্ধ কাঁদিয়া ফেলে, আমি সেই অমূল্য ধন কি মৃত্তিকাখণ্ডের সহিত বিনিময় করিব? না হয় ভিক্ষা মাগিয়া খাইব, তাহাও আমার পক্ষে শ্রেয়; তথাপি আমি প্রাণ ধরিবার মন্ত্র ও দেবতা ধরিবার যন্ত্র পরিত্যাগ করিয়া, কখনই জীবন ধারণে সক্ষম হইব না।”

সঙ্গী’ত শাস্ত্র সম্বন্ধে দেবতা এবং প্রাচীন ঋষিদিগের কিরূপ অভিমতি ছিল, তাহার আভাস জন্য সঙ্গীত গ্রন্থাদি হইতে গুটীকতক শ্লোক উদ্ধৃত করিয়া দিলাম।

নাদান্ধেস্ত পরম্পারং ন জানাতি সরস্বতী,

অদ্যাপি মজ্জনভরাত্ত দ্বীং বহতি বক্ষসি।

নাহং বসামি বৈকুণ্ঠে যোগিনাং হৃদয়ে ন চ,

মত্তক্তা যত্র গারস্তি তত্র তিষ্ঠামি নারদ!

নারদসঙ্গীতসংহিতা।

পুজা কোটিগুণং ধ্যানং ধ্যানাৎ কোটিগুণং জপঃ,

জপাৎ কোটিগুণঙ্গানং গানাৎ পরতরং নহি।

[ ৮ ]

8

ন ঘৃতে তাদৃশী প্রীতির্ম ক্ষীরে নচ গুগ গুলৌ,

বাদৃশী চৈব গান্ধর্ব্বে মম প্রীতিবরাননে!

শিবসঙ্গীত ॥

বীণাবাদনতত্বজ্ঞঃ রাগবিদ্যা-বিশারদঃ,

মৃচ্ছণাশ্রুতিসম্পন্নঃ মোক্ষমার্গঞ্চ গচ্ছতি।

ত্রিবর্গফলদাঃ সর্ব্বে দানমধ্যয়নং জপঃ,

একং সঙ্গীতবিজ্ঞানং চতুব্বর্গফলপ্রদং।

গান্ধর্ব্ববেদ ॥

সঙ্গীতসাহিত্যরসানভিজ্ঞঃ খ্যাতঃ পশুঃ পুচ্ছবিষাণহীনঃ,

চরত্যসৌ কিং? তৃণমত্তি নো বা পরং পশূনামুপবাসহেতুঃ।

সঙ্গীতমহোদধৌ ॥

ধর্মার্থকামমোক্ষাণামিদমেবৈকসাধনং,

নাদবিদ্যা পরা লব্ধা সরস্বত্যাঃ প্রসাদতঃ।

সঙ্গীতরত্নাকর ।।

আরও পড়ূনঃ

13 thoughts on “বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত সূচিপত্র”

Leave a Comment