বেহালার উৎপত্তি ও আকৃতি প্রকৃতি এবং ধারণ প্রণালী | বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত

বেহালার উৎপত্তি ও আকৃতি প্রকৃতি এবং ধারণ প্রণালী – বেহালা ভারতীয় যন্ত্র মধ্যে পরিগণিত। এই ধনু যন্ত্র (১) অতি প্রাচীন ও হিন্দুজাতির বড় আদরের সামগ্রী। কথিত আছে, লঙ্কাধিপতি দশানন কর্তৃক এই যন্ত্র প্রথম সৃষ্ট হয়। তখন ইহা রাবণাস্ত্রম অথবা রাবণার বলিয়া অভিহিত হইত। কালক্রমে প্রদেশগত ভাষা বিভিন্নতায়, কিম্বা কথঞ্চিৎ রূপান্তর প্রাপ্ত হইয়া অমৃতি নামও ধারণ করিয়াছিল।

যাহা পূর্ণ সত্য, তাহার কথনই ক্ষয় নাই; সর্ব্বত্রই তাহার বিজয় নিশান উড্ডীয়মান হর। এই জন্য জাতিগত বিদ্বেষানলে দগ্ধ হইলেও, মুসলমান বণিকগণ এই যন্ত্রকে হৃদয়ে স্থান দিয়া পারস্য ও আরবাদি দেশে লইয়া যায়। ঐ সকল দেশবাসীগণ এই নুতন যন্ত্র অতীব যত্নের সহিত ব্যবহার করিতে থাকেন ও ইহার “কমাজে জৌজ” নাম প্রদান করেন।

আরব্য ও পারস্যাদি উপন্যাসে পাঠ করা যায় যে, মুসলমান গায়িকাগণ সুমধুর বীণাযন্ত্রের সুরসংযোগে গান গাহিয়া, প্রেমিক-প্রেমিকাগণের হৃদয়রঞ্জন করিতেন। সম্ভবতঃ তাহা এই যন্ত্র হইতে পারে। অনন্তর মহম্মদীয়দিগের দিগ্বিজয়ের সহিত উহা ইউরোপখণ্ডের স্পেন দেশে নীত হয়।

স্পেনিগণ সুখ, সম্পত্তি, স্বাধীনতা সমস্ত হারাইয়া যেন তাহার বিনিময় স্বরূপ ঐ “কমাজে জৌজ” যন্ত্রখানি প্রাপ্ত হইল। তাহার পর বহু শতাব্দি ধরিয়া ঐ যন্ত্র ইউরোপের নানা দেশে আদৃত ও রূপান্তরিত হইতে হইতে, সভ্য জগতের নব-রবি উদিত হইবার সময় (অর্থাৎ খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দিতে) গ্যাস্পর্ড নামক জনৈক ইটালীয় শিল্পী দ্বারা আধুনিক আকার প্রাপ্ত হইয়াছে ও সমস্ত 

অদ্রীমণ্ডলে অধিকার লাভ করিয়াছে (২)। ঐ যন্ত্রকে ইটালীয়গণ “ভিয়াল; ও ইংলভীয়গণ “ভারলিন” কহিয়া থাকেন; এই জন্য আমরা ঐ নামের অপভ্রংশে বেহালা নাম ব্যবহার করিয়া থাকি। বেহালা আমাদিগের অভি পুরাতন সম্পত্তি হইলেও বর্তমান যুগে উহা ইউরোপীয়গণ কর্তৃক ভারতে আনীত হইয়াছে, এই জন্য উহার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ- গুলির নাম প্রায়ই ইউরোপীয় ভাষায় কথিত হয়। যাহা হউক, উহাদিগের সাধারণ বাঙ্গালা ও প্রধান প্রধান অঙ্গগুলির ইংরাজী নাম নিয়ে প্রদত্ত হইল।

 

বেহালার উৎপত্তি ও আকৃতি প্রকৃতি এবং ধারণ প্রণালী | বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত

 

বেহালার উৎপত্তি ও আকৃতি প্রকৃতি এবং ধারণ প্রণালী

 

বেহালার উৎপত্তি ও আকৃতি প্রকৃতি

—————————————————————————————————————-

(২) যদিও এই বস্ত্র দেশ দেশান্তরে নীত হইয়াছে এবং দেশ ও রুচিভেদে উহার রূপ স্বতন্ত্র হইয়াছে বটে, কিন্তু কার্য্যকারিতায় অধিক বিভিন্নতা লক্ষিত হয় না। আমাদিগের দেশে বৈষ্ণষ ও স্বরবেশ বাদ্বারের সধ্যে সারুন্দে বলিয়া যে প্রাচীন বর্ম ব্যবহৃত এয়, তাহার হয় অধিকল বেহালায় ন্যায়।

বেহালার উৎপত্তি ও আকৃতি প্রকৃতি

 

ধারণ-প্রণালী

কোন্ হস্তে বেহালা এবং কোন্ হন্তে ছড় ধারণ করত কিরূপ প্রণালীতে বাজাইতে হয়, ইহা সকলেই অবগত আছেন। অতএব, সে বিষয়ে আর অধিক কিছু লিখিবার আবশ্যকতা নাই। তবে যন্ত্র খানি ও ছড়গাছটা কিরূপ ভাবে ধরিলে সকল প্রকার সুবিধা হইতে পারে, তাহারই পরিচয় কথঞ্চিৎ লিখিত হইতেছে। বেহালাখানি বাম স্কন্ধের উপর রাখিয়া বাম পার্শ্বের দাড়ি দ্বারা টেপিসের বাম দিকে একটু দৃঢ় রূপে ধারণ করাই উচিত; এবং যন্ত্রের ঘাড়ী অর্থাৎ গ্রীবা দেশটা যেন তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলির মধ্যস্থলে সংলগ্ন মাত্র থাকে। করতল অথবা হস্তের অন্য কোন স্থানে উহার সংস্পর্শ হইবে না।

দাড়ী দ্বারা ধরিয়াই উহাকে আবন্ধ রাখিতে হয়। এমন কি যন্ত্রের গ্রীবা দেশটা ছাড়িয়া দিলেও যেন বেহালাখানি পতিত না হয়। এইরূপ স্বত হইলে, রাগাদি বাজাইবার সময় অঙ্গুলি সকল নানা স্থানে বিচরণ করাইবার যথেষ্ট সুবিধা হইবে। ইউরোপীয়গণ ঐ রূপেই যন্ত্রটা ধরিয়া থাকেন। ছড়গাছটীর গোড়াতেই ধরা বিধি। উপরে তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা এই তিনটা অঙ্গুলি নিয়ত ও কনিষ্ঠ অঙ্গুলি সময় সময় ব্যবহার করিতে হইবে। বৃদ্ধাঙ্গুলিটী চুল ও শলার মধ্যেই থাকিবে। বাজাইবার সময় হাত যেন আড়ষ্ট না থাকিয়া কবজির সহিত সঞ্চালিত হয়, সেইরূপ অভ্যাস করিবেন।

আরও পড়ুনঃ

1 thought on “বেহালার উৎপত্তি ও আকৃতি প্রকৃতি এবং ধারণ প্রণালী | বেহালা-দর্পণ ও গণিত-সঙ্গীত”

Leave a Comment